সরকারের কোনো কাজে ভুল বা ত্রুটি হলে তা স্পষ্টভাবে ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়; বরং সরকারের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক দেশ গড়ে তুলতে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) আয়োজিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেন, একটি সরকার বা প্রতিষ্ঠান কাজ করতে গেলে ভুল-ত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই ভুলকে আড়াল না করে চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করা জরুরি। সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রমে ভুল থাকলে তা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভুল ধরিয়ে দেওয়া মানে সরকারের বিরোধিতা করা নয়; বরং রাষ্ট্রের উন্নতি ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য গঠনমূলক সমালোচনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সরকার ভুল করলে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিন।’ তার মতে, বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা, যা আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, বাসযোগ্য ও মানবিক হবে। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে, কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তা সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
আইনমন্ত্রী বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যেতে হবে। কাজ করলে ভুল হবে, কিন্তু সেই ভুলকে সংশোধন করে এগিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে ন্যায়, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধকে সামনে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের মূল আয়োজন ছিল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতিভা অন্বেষণ এবং তাদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ। আইনমন্ত্রী এ ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সমাজের পিছিয়ে থাকা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা এবং তাদের প্রতিভাকে সমাজের সামনে তুলে ধরা মানবিক দায়িত্বের অংশ। ‘অন্ধকে আলো দেওয়ার মতো ভালো কাজ আর কিছু হতে পারে না’—উল্লেখ করে তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিভা বিকাশে কাজ করছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, শুধু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নয়, সমাজের সব মানুষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
আইনমন্ত্রী জানান, প্রায় তিন বছর আগে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদেরও এই কার্যক্রমের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, তারাও মানুষ এবং সমাজের অন্য সবার মতো তাদেরও অধিকার রয়েছে। তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো মানুষকে তার পরিচয় বা শারীরিক অবস্থার কারণে পিছিয়ে রাখা উচিত নয়। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে একটি অধিকতর মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপযুক্ত সুযোগ ও সহায়তা পেলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরাও নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন। তাদের প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া সম্ভব।
দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে পরিণত করতে হবে যেখানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রকৃত স্বাদ মানুষ পাবে। তিনি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন, যেখানে ফ্যাসিজম আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই গণতন্ত্র কার্যকর হয়। এ জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা উচিত নয়। রাজনৈতিক বা সামাজিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের ভুল হলে সেটি যেমন প্রকাশ্যে তুলে ধরতে হবে, তেমনি ভালো উদ্যোগের প্রশংসাও করা উচিত।
তিনি বলেন, যারা অন্যায় ও হত্যাকাণ্ড দেখেও চোখ বন্ধ করে রয়েছেন, তাদের চোখ খুলতে হবে। অন্যায় বা অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। রাষ্ট্রের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তার মতে, দেশ গড়ার কাজ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিজেদের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিকদের সচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, মহানবীর জীবন ও শিক্ষা থেকে ন্যায়, সহমর্মিতা, মানবিকতা, ক্ষমাশীলতা ও মানুষের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা পাওয়া যায়। রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় এসব মূল্যবোধ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সমাজের দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মহানবীর আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতিভা বিকাশে এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; বরং তাদের সামাজিক স্বীকৃতি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সব মিলিয়ে, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সরকারের ভুল-ত্রুটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে গঠনমূলক সমালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার ও প্রতিভা বিকাশে আরও সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে অন্যায় ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য রাষ্ট্র নিশ্চিত হবে।