পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) ও ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে শুরু হওয়া এ শোভাযাত্রায় সাদা পোশাক ও টুপি পরা মানুষের পাশাপাশি ছিল কালেমাখচিত পতাকা, প্ল্যাকার্ড, রঙিন ফেস্টুন ও জাতীয় পতাকা। ধর্মীয় আবেগ, নবীপ্রেম ও শান্তির বার্তায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়ার উদ্যোগে আয়োজিত জশনে জুলুসে সংগঠনটির সভাপতি শাহসূফী ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী মাইজভাণ্ডারী নেতৃত্ব দেন। ভোরের আলো ফোটার আগ থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ সুফিবাদী মানুষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জড়ো হতে শুরু করেন।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বিশাল জনসমাগমে পরিণত হয়। নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকের পরনে ছিল সাদা টি-শার্ট বা পোশাক এবং মাথায় সাদা টুপি। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল কালেমাখচিত পতাকা, প্ল্যাকার্ড ও বিভিন্ন ধর্মীয় ও শান্তির বার্তাসংবলিত ফেস্টুন।
শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকা বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল ‘ইয়া নবী সালামু আলাইকা’ ও ‘ইয়া রাসূল সালামু আলাইকা’। শোভাযাত্রা এগিয়ে যাওয়ার সময় ধর্মীয় নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা। অংশগ্রহণকারীদের অনেকে বিশাল জাতীয় পতাকাও বহন করেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিম গেট থেকে জশনে জুলুস শুরু হয়। পরে শোভাযাত্রাটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। দোয়েল চত্বর, শিক্ষা ভবন ও সচিবালয় সড়ক হয়ে জুলুসটি আবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফিরে আসে। শোভাযাত্রার পুরো পথজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে রাজধানীর ওই অংশে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
জশনে জুলুস শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশ। এতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবন ও আদর্শ, মানবিকতা, শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বক্তারা বর্তমান বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে মহানবীর শিক্ষা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশে শাহসূফী ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তার শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করলে সমাজে ন্যায়, মানবিকতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (দ.) মানুষকে সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে যখন যুদ্ধ, সংঘাত ও অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন মহানবী (দ.)-এর আদর্শ ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বক্তারা বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মহানবী (দ.)-এর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের চর্চা বাড়াতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি মানবিকতার বিকাশেও তার আদর্শ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহজাদা সৈয়দ মেহেবুবে মইনুদ্দীন, মইনীয়া যুব ফোরামের সভাপতি শাহজাদা সৈয়দ মাশুক মইনুদ্দীন, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর এমিরেটস ড. আনিসুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আখতারুজ্জামানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি।
এ ছাড়া আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়ার সাধারণ সম্পাদক খলিফা আলমগীর খান, মাওলানা মুফতী বাকি বিল্লাহ আজহারী, মাওলানা রুহুল আমিন ভূঁইয়াসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও আলেম-ওলামারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজনে নারী অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন বয়সী নারী ধর্মীয় এই আয়োজন ও শোভাযাত্রায় অংশ নেন। ফলে জশনে জুলুসটি শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের আয়োজন না হয়ে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহণে বড় জনসমাবেশে পরিণত হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবনাদর্শ মানুষের মধ্যে শান্তি, ভালোবাসা, সহনশীলতা ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও অস্থিরতার সময়ে তার শিক্ষা অনুসরণ করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জশনে জুলুস ও শান্তি মহাসমাবেশকে ঘিরে রাজধানীর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। ধর্মীয় স্লোগান, পতাকা ও বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুনে শোভাযাত্রার পুরো পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। অংশগ্রহণকারীরা মহানবী (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের পাশাপাশি শান্তি ও মানবতার কল্যাণের বার্তা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে দেশ, জাতি, শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের বর্তমান ইমাম শাহ সুফি ড. শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী।
সব মিলিয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত জশনে জুলুসে ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে শুরু হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণের পর শোভাযাত্রাটি একই স্থানে ফিরে আসে। পরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশে মহানবী (দ.)-এর আদর্শ অনুসরণ, মানবিকতা, ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বশান্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ মোনাজাতের মধ্য দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।