টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক চর্চা, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই নিয়মভিত্তিক হতে হবে। তার ভাষায়, গণতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। মানুষের চিন্তা, আচরণ এবং রাজনৈতিক চর্চার প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটতে হবে।
তিনি বলেন, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। নিজের মতের সঙ্গে অমিল থাকলেও অন্যের মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা বাড়লে টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকেনি। তিনি দাবি করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতান্ত্রিক চর্চার সূচনা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে খালেদা জিয়া সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে বিভিন্ন সময়ে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, দলটি গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। তার দাবি, গত ১৫ বছরে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে ব্যর্থ ঘোষণা করা বা পদত্যাগের দাবি তোলা গণতান্ত্রিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধের সমাধান সংসদ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। ‘মব’ সংস্কৃতি বা রাস্তায় চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, সাংবাদিকদের নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরতে হবে। তবে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো এবং আর্থিক বাস্তবতা অনেক সময় স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি চাপ না থাকলেও অনেক সাংবাদিক আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে চলেন, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ইতিবাচক নয়।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা এবং ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় মালিকপক্ষ ও সাংবাদিকদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির মহাসচিব বলেন, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা ছোট একটি ভিডিও মুহূর্তেই একজন ব্যক্তির দীর্ঘদিনের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতিমালা নিয়ে ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি কঠিন রূপান্তরকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমাধানে সময় প্রয়োজন। টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল এবং সমাজের সব অংশকে আরও ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।