বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত করে তা দেশে ফিরিয়ে আনাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে অর্থপাচার শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদেরও সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২২ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে চার দিনব্যাপী ছায়া জাতিসংঘ সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তরুণদের অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে জনগণের সেবাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল ও সহযোগিতামূলক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
অর্থপাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যে অর্থ পাচার হয়েছে, সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান এবং সহযোগিতা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কাজে আইনজীবী, হিসাববিদ, আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। অর্থপাচার শনাক্তকরণ, সম্পদের অবস্থান নির্ধারণ এবং আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পেশাগত দক্ষতা ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
তরুণদের উদ্দেশে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পরিবর্তনের যাত্রায় স্বচ্ছতা, সততা ও দায়িত্ববোধকে সামনে রেখে তরুণদের ভূমিকা রাখতে হবে। তার মতে, টেকসই অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
তিনি তরুণ সমাজকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সততা ও স্বচ্ছতার চর্চার মাধ্যমে একটি নতুন ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। তরুণদের নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, কাঙ্ক্ষিত সমাজ নির্মাণে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তরুণদের আরও সক্রিয় হতে হবে। তরুণরা শুধু ভবিষ্যতের নেতৃত্বের অপেক্ষায় থাকবে না; বরং বর্তমান সময়েই সঠিক বিচার-বিবেচনা, দায়িত্ববোধ এবং দৃঢ়তার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আরও বলেন, তরুণরা নিজেদের সংগঠিত করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সীমিত সম্পদ ও সুযোগের মধ্যেও তরুণদের নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ গড়ে তোলার সক্ষমতা রয়েছে। এ কারণে তরুণদের উৎসাহিত করা এবং তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
চার দিনব্যাপী ছায়া জাতিসংঘ সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ঢাকাস্থ জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেঝনিয়াক, ঢাকাস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান আলবার্তো জিওভানেত্তি এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
সরকারের অর্থপাচারবিরোধী উদ্যোগের পাশাপাশি তরুণদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চায় সম্পৃক্ত করার আহ্বানকে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং তা দেশের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।