Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

সূর্যগ্রহণের সময় যে আমলগুলো করতে বলেছেন মহানবী (সা.)

সূর্যগ্রহণের সময় যে আমলগুলো করতে বলেছেন মহানবী (সা.)

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহ তাআলার কুদরতের অন্যতম নিদর্শন। পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের নির্দিষ্ট গতিপথের কারণে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করে এবং সূর্যের আলো পৃথিবীর কোনো কোনো স্থান থেকে আংশিক বা পুরোপুরি দেখা যায় না, তখন তাকে সূর্যগ্রহণ বা কুসুফ বলা হয়। অন্যদিকে পৃথিবী যখন সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান করে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে, তখন সেটিকে চন্দ্রগ্রহণ বা খুসুফ বলা হয়।

ইসলামের আগের যুগে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণকে ঘিরে মানুষের মধ্যে নানা কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। অনেকেই মনে করত, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যুর কারণে সূর্য কিংবা চন্দ্রগ্রহণ হয়ে থাকে। ইসলাম এসব ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কারও জন্ম বা মৃত্যুর কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। বরং এগুলো আল্লাহ তাআলার নিদর্শন, যা মানুষের জন্য চিন্তা, উপলব্ধি এবং আল্লাহর প্রতি ফিরে আসার একটি সুযোগ তৈরি করে।

পবিত্র কোরআনে সূর্য ও চাঁদের বিষয়ে বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও সৃষ্টির নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা ইউনুসে আল্লাহ তাআলা সূর্যকে কিরণোজ্জ্বল এবং চাঁদকে আলো হিসেবে সৃষ্টি করার কথা জানিয়েছেন। সুরা নাবায় সূর্যকে প্রজ্বলিত প্রদীপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সুরা নুহ ও সুরা ইবরাহিমে সূর্য ও চাঁদকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

হাদিসে সূর্যগ্রহণের সময় মহানবী (সা.)-এর করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়। হজরত আবু বকর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে একবার সূর্যগ্রহণ শুরু হলে তিনি দ্রুত মসজিদে প্রবেশ করেন এবং সাহাবিদের নিয়ে নামাজ আদায় করেন। সূর্য পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত তিনি নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, কারও মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। যখন তোমরা এমন ঘটনা দেখবে, তখন গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নামাজ ও দোয়া করতে থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৮৩)

আরেকটি হাদিসে হজরত আবু মুসা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে সূর্যগ্রহণ হলে তিনি দ্রুত মসজিদে যান। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে কিয়ামতের কোনো বড় ঘটনা হয়তো সংঘটিত হতে যাচ্ছে। এরপর তিনি দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সিজদার মাধ্যমে নামাজ আদায় করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন। কারও মৃত্যু বা জন্মের কারণে এগুলোর গ্রহণ হয় না। যখন মানুষ গ্রহণ দেখতে পাবে, তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, তাকবির দেবে, নামাজ পড়বে এবং সদকা করবে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

সূর্যগ্রহণের সময় কী করবেন

হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী সূর্যগ্রহণের সময় একজন মুসলমানের প্রধান করণীয় হলো আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা। এ সময় নামাজ আদায়, দোয়া, জিকির, তাকবির এবং সদকা করার কথা হাদিসে এসেছে। সূর্যগ্রহণ শুরু হলে অযথা কুসংস্কার, ভয় বা গুজবে না গিয়ে আল্লাহর কুদরত স্মরণ করা এবং ইবাদতে মনোযোগী হওয়াই ইসলামের শিক্ষা।

সূর্যগ্রহণের নামাজকে আরবিতে সালাতুল কুসুফ বলা হয়। এটি নফল নামাজ হিসেবে আদায় করা হয়। এ নামাজের জন্য সাধারণ নামাজের মতো আজান ও ইকামত নেই। তবে মানুষকে নামাজের জন্য একত্র করতে ‘আস-সালাতু জামিয়া’ অর্থাৎ ‘নামাজের জন্য সমবেত হও’—এ ধরনের ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে।

সূর্যগ্রহণের নামাজ সাধারণত দুই রাকাত। এ নামাজে কিরাত, কিয়াম, রুকু ও সিজদা তুলনামূলক দীর্ঘ করার কথা হাদিসে পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) গ্রহণের নামাজে দীর্ঘ সময় ধরে কিরাত ও রুকু-সিজদা করেছেন বলে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। গ্রহণ চলাকালীন নামাজ শেষ হয়ে গেলে আবার নামাজ আদায় করা বা দোয়া, জিকির ও অন্যান্য ইবাদতে ব্যস্ত থাকা যায়।

এই নামাজের পদ্ধতি নিয়ে মাজহাবভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী প্রতি রাকাতে একটি রুকু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। শাফেয়ি মাজহাবসহ কিছু ফকিহের মতে, প্রতি রাকাতে দুটি রুকু করার পদ্ধতি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই স্থানীয় আলেম বা নিজ নিজ মাজহাবের নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা অনুসরণ করা যেতে পারে।

সূর্যগ্রহণের সময় শুধু নামাজই নয়, আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা, তাসবিহ-তাহলিল ও তাকবির পাঠ করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করাও সুন্নত আমলের অন্তর্ভুক্ত। গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব ইবাদতে থাকা উত্তম।

গ্রহণ নিয়ে কুসংস্কার থেকে বিরত থাকার শিক্ষা

ইসলাম সূর্যগ্রহণকে কোনো মানুষের জন্ম-মৃত্যু, ভাগ্য বা অমঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত করেনি। মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা হলো, এমন প্রাকৃতিক ঘটনা মানুষকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই গ্রহণকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি, কুসংস্কার, অশুভ লক্ষণ বা ভিত্তিহীন ধারণা ছড়ানো ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সূর্য ও চাঁদের গতিপথ এবং গ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনাগুলো আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ব্যবস্থার অংশ। এগুলোর বৈজ্ঞানিক কারণ জানা থাকলেও একজন মুমিনের জন্য এসব ঘটনা আল্লাহর কুদরত ও সৃষ্টির নিখুঁত ব্যবস্থার কথা স্মরণ করার সুযোগ তৈরি করে।

সব মিলিয়ে, সূর্যগ্রহণের সময় মহানবী (সা.) মুসলমানদের নামাজ আদায়, দোয়া, তাকবির, জিকির ও সদকার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ কোনো মানুষের জন্ম বা মৃত্যুর কারণে হয় না। তাই গ্রহণের সময় কুসংস্কার ও গুজব থেকে দূরে থেকে আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী হওয়াই ইসলামের নির্দেশিত পথ। গ্রহণের সময় সালাতুল কুসুফ আদায় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার মাধ্যমে একজন মুসলমান এ ঘটনাকে ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।