ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির কর্মকর্তা আফেক মস্কোভিচের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির অনুরোধ জানিয়েছে তুরস্ক। গাজা উপত্যকায় গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র কর্মীদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা ও আটকের ঘটনায় চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে তুরস্কের এই পদক্ষেপের তথ্য জানানো হয়। এর আগে শুক্রবার তুরস্কের বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, নেতানিয়াহু ও আফেক মস্কোভিচের বিরুদ্ধে গত ১৪ জুলাই জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাদের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তুরস্কের বিচারমন্ত্রী বলেন, গণহত্যার অভিযোগে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির আইন মন্ত্রণালয় তাদের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির অনুরোধ জানাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
তুরস্কের অভিযোগ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু ও মস্কোভিচের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, গুরুতর বেআইনি স্বাধীনতা হরণ, ইচ্ছাকৃত আঘাত, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, গুরুতর ডাকাতি এবং যানবাহন ছিনতাই বা জবরদখলের মতো অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলসীমায় গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সশস্ত্র হস্তক্ষেপ এবং পরে তাদের আটক করার ঘটনাকে যুক্ত করেছে তুরস্ক।
আঙ্কারা জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের জন্য দেশটিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তুরস্ক। দেশটির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থনও অব্যাহত রয়েছে।
তুরস্কের এই পদক্ষেপের পেছনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে উত্তর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে। ওই ঘাঁটিতে তুর্কি সেনাদের অবস্থান তৈরি হচ্ছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ইসরায়েল হামলা চালালেও তুরস্ক ও সিরিয়া সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
গাজায় ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় এর আগেও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল তুরস্ক। পাশাপাশি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে আঙ্কারা। তবে ইসরায়েল তুরস্কের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। গত মে মাসে গাজার উদ্দেশে যাত্রা করা বহরের অন্তত দুটি নৌযানে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। অবরুদ্ধ গাজায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে বহরটি যাত্রা করেছিল। এর আগেও গাজামুখী ত্রাণবাহী নৌবহর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি বাহিনীর বাধার মুখে পড়েছিল।
ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি বাহিনীর বাধা ও হামলার অভিযোগের পর বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফ্রান্স, ইতালি ও অস্ট্রেলিয়াও এ ঘটনার বিষয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তুরস্কের সর্বশেষ উদ্যোগ নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়; এটি সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের ও অস্থায়ীভাবে আটক করার অনুরোধ হিসেবে কাজ করে। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব আইন ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।