Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে বাবার মৃত্যুদণ্ড

কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে বাবার মৃত্যুদণ্ড

বগুড়ার শেরপুরে কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে মো. আব্দুল খালেক (৫১) নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বগুড়া শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা দায়রা জজ মারুফ হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আলী আসগর।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল খালেক শেরপুর উপজেলার বাগড়া বস্তি এলাকার বাসিন্দা। আদালতে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালত তাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর ভুক্তভোগী কিশোরীর মা, যিনি আসামির দ্বিতীয় স্ত্রী, বাদী হয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার নথি অনুযায়ী, ভুক্তভোগী কিশোরী তার বাবা আব্দুল খালেক ও সৎমায়ের সঙ্গে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করত। পারিবারিক পরিবেশে থাকা অবস্থায় তার ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে কিশোরীর সৎমা প্রতিদিনের মতো স্থানীয় একটি চাতালে ধান সিদ্ধ করার কাজে যান। এ সময় বাড়িতে থাকা আব্দুল খালেক তার কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়। ঘটনার পর বিষয়টি কাউকে জানালে গুরুতর পরিণতির হুমকি দেওয়া হয় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর কিশোরীর আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন পরিবারের সদস্যরা। সে বাড়ির বিভিন্ন কাজ করা বন্ধ করে দিলে তার সৎমা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারধর করতে থাকেন। একপর্যায়ে নির্যাতনের শিকার কিশোরী তার সৎমাকে বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের কথা জানায়। কিন্তু মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সৎমা তার অভিযোগ বিশ্বাস করেননি। বরং মেয়েটির ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় কিশোরী পরে নির্যাতনের বিষয়টি তার দুই সহপাঠীকে জানায়। সহপাঠীদের কাছ থেকে ঘটনা জানার পর স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হন এবং থানায় অভিযোগ করার ব্যবস্থা করেন। এরপর ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলা দায়েরের পর তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং মামলার অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। পরে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আদালতে মামলার দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন।

শিশু ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। বিশেষ করে পরিবারের ভেতরে কোনো শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দ্রুত আইনগত সহায়তা দেওয়া এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন। আদালতের রায়ে অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি কার্যকর করার প্রক্রিয়াও নির্ধারিত নিয়মে সম্পন্ন হয়।

এ মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রায় ছয় বছর আগে সংঘটিত একটি গুরুতর অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আদালত আব্দুল খালেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। তবে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। ফলে বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। কোনো শিশু বা কিশোরী নির্যাতনের শিকার হলে তাকে দোষারোপ বা অবিশ্বাস না করে নিরাপদ পরিবেশে কথা বলার সুযোগ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে অপরাধীকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়।

বগুড়ার শেরপুরের এ ঘটনায় আদালতের রায় আবারও শিশুদের সুরক্ষা এবং পারিবারিক পরিবেশে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।