জনগণ অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম ও স্বাবলম্বী হলেই একটি রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষকে অভাব-অনটনের মধ্যে রেখে কিংবা তাদের কথা বলার সুযোগ সীমিত করে কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাকে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে সরকার কাজ করছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি পাটকল বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু অনুষ্ঠানে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পুনরায় উৎপাদনমুখী করার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি দেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ বর্তমান অবস্থার তুলনায় ভবিষ্যতে আরও ভালো জীবনযাপন করতে পারবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, অর্থনীতির মূল শক্তি হলো দেশের মানুষ এবং তারা যদি নিজেদের পরিবার ও সমাজের জন্য ভালোভাবে আয়-রোজগারের সুযোগ পায়, তাহলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতাও বাড়বে।
রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার ও সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষকে শুধু রাজনৈতিক অধিকার দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার সুযোগও তৈরি করতে হবে। এ কারণে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
দেশীয় বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়। তবে একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। তাই তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব নীতি সহায়তা প্রয়োজন, সরকার সেগুলো দেওয়ার চেষ্টা করবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা। কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নয়, বরং দেশের সাধারণ মানুষ যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল পায়, সেই লক্ষ্যেই সরকার কাজ করবে। উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা হলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে মানুষের জীবনযাত্রায় স্থিতিশীলতা আসবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বন্ধ থাকা তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার উদ্যোগকে এই নীতির একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনের আওতায় এনে সেখানে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। নতুন দায়িত্ব নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের মাধ্যমে পাটকলগুলোকে কার্যকর করে তুলতে পারলে স্থানীয় পর্যায়েও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনটি পাটকলের দায়িত্ব নেওয়া দুই ব্যবসায়ী গ্রুপকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো সফলভাবে পরিচালিত হবে এবং সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। এছাড়া প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী এবং হ্যামকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম মোস্তফাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে দেশীয় উদ্যোক্তা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হলে শুধু বড় শিল্প বা বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে দেশের স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদেরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের উদ্যোক্তার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হিসেবে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের কথা বলেছেন, যেখানে সাধারণ মানুষ বর্তমানের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকবে। জনগণের আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।