Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

দুদকে এস আলম ও সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

দুদকে এস আলম ও সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস আলম গ্রুপ, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগকারী ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসীন আলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া নিজ উদ্যোগে দুদকের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ দায়ের করায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা আবার এই বরখাস্তের তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। ফলে ইয়াসীন আলীকে ঘিরে ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ইয়াসীন আলীকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি; তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পূর্বানুমতি না নিয়েই দুদকে অভিযোগ দায়ের করা। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

তবে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ইয়াসীন আলীকে বরখাস্ত করার তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। ফলে একই প্রতিষ্ঠানের দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা যায়, গত ২৬ জুলাইয়ের একটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড, গ্যালাক্সি সোয়েটার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দায়েরের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরদিন ২৭ জুলাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতাও ইয়াসীন আলীকে দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে পরবর্তীতে অভিযোগ দায়েরের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে এস আলম গ্রুপ, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুল মাওলাসহ মোট ৩৮ জনের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডের ঋণসীমা ১০০ কোটি টাকা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। পরবর্তীতে ওই বর্ধিত ঋণসীমার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।

ব্যাংকের দাবি, চারটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের পৃথক তদন্তে সুপ্রভ কম্পোজিটের ঋণ অনুমোদন ও অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির ঋণসীমা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া, অর্থ বিতরণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিয়ে নিরীক্ষায় বিভিন্ন অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলেও ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পরও তাকে ঘিরে ইসলামী ব্যাংক এবং এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্তাধীন এবং অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া।

ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকাল নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই নানা ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশেষ করে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ, বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও ব্যাংকটির আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ব্যাংক খাতের অনিয়ম তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং তাদের মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো কর্মকর্তা যদি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থার কাছে তথ্য বা অভিযোগ দেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—সেটিও আলোচনার বিষয়। ইয়াসীন আলীর ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া অভিযোগ দায়েরের যে কারণ দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আরও স্পষ্ট হতে পারে।

অন্যদিকে, দুদকে দেওয়া অভিযোগে এস আলম গ্রুপ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে যে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটিও এখন তদন্তের বিষয়। ৫০০ কোটি টাকার ঋণ কীভাবে অনুমোদিত হয়েছিল, ঋণসীমা কীভাবে বাড়ানো হয়েছিল, অর্থ কোথায় ব্যবহার হয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার কথা।

সব মিলিয়ে, একদিকে ইসলামী ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্ত চলছে, অন্যদিকে সেই অভিযোগ দুদকে তুলে ধরা ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসীন আলীর বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়নি এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরই তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভিন্ন বক্তব্যের কারণে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে নজর থাকবে।