Loading...

  • 26 Jul, 2026

যানজটের নগরী ঢাকা: টেকসই সমাধানে গণপরিবহনকেই দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

যানজটের নগরী ঢাকা: টেকসই সমাধানে গণপরিবহনকেই দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসার প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াত করেন। কিন্তু দেশের সম্ভাবনার এই মহানগর দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ যানজটের সমস্যায় জর্জরিত। সময়ের সঙ্গে এ সংকট আরও তীব্র হয়েছে, যা এখন শুধু পরিবহন খাতের সমস্যা নয়; বরং অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা এবং নাগরিক জীবনের মানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা হলো সীমিত সড়ক অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় রাজধানীতে সড়কের পরিমাণ অনেক কম। এর সঙ্গে প্রতিদিন নতুন নতুন যানবাহন যুক্ত হওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

গবেষণা ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যানজটের কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি পায়, জ্বালানির অপচয় ঘটে এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সেবায় বিলম্ব হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ। তাই যানজটের কারণে সময়ের অপচয় সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতিতে পরিণত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান একই এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল মানুষের যাতায়াতের চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের অভাবে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এছাড়া অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতাও যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই যানজট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সিঙ্গাপুর ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আধুনিক এমআরটি ও বাসব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জাপানের টোকিও, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল এবং ভারতের দিল্লিও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে নগর পরিবহনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে মেট্রোরেল চালু, নতুন মেট্রো লাইন নির্মাণ, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিভিন্ন ফ্লাইওভার নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং একটি সমন্বিত নগর পরিবহন পরিকল্পনার আওতায় এসব উদ্যোগ পরিচালিত হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে।

তাদের মতে, পরিকল্পিত সব মেট্রোরেল লাইন দ্রুত বাস্তবায়ন, কার্যকর বিআরটি চালু, বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন, আধুনিক ও নিরাপদ গণপরিবহন বৃদ্ধি, একীভূত টিকিটিং ব্যবস্থা, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, পথচারীবান্ধব ফুটপাত, সাইকেল লেন এবং শহরতলির সঙ্গে কমিউটার রেল সংযোগ সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন জরুরি।

এছাড়া সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোরেল, বাস, রেল, নৌপথ, সাইকেল ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামোকে একীভূত করে একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই ঢাকা একটি বাসযোগ্য ও টেকসই মহানগরে পরিণত হবে। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর নগর পরিকল্পনার পরিবর্তে গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়নই হতে পারে ভবিষ্যতের ঢাকা গড়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।