রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় নতুন মোড় এসেছে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়েছে। এই শুনানি শেষে আদালত যেকোনো সময় রায়ের জন্য দিন ধার্য করতে পারেন। ফলে দেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরের আগে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। পরে বেলা ১১টা ২৪ মিনিটে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। অপর আসামি স্বপ্না আক্তারকে আদালতে আনা হয় বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্বপ্না আক্তার শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তাকে হাসপাতাল থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু মামলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ওই শিশুর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেন। ঘটনার পর ফ্ল্যাটের বাসিন্দা এবং মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে আসে। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়।
একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে নিহত শিশুর বাবা পল্লবী থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে দ্রুত বিচার কার্যক্রম শুরু হয় এবং মামলাটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।
গত ১ জুন ট্রাইব্যুনাল সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটি পূর্ণাঙ্গ বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করে। এরপর ২ জুন আদালতে শিশুটির মা-বাবাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। তাদের সাক্ষ্যে ঘটনার বিভিন্ন দিক আদালতের সামনে উঠে আসে।
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আসামি সোহেল রানার দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য। ঘটনার পর ২০ মে ঢাকার একটি আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেই জবানবন্দিতে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতকে অবহিত করেন।
তবে বিচার চলাকালে আদালতে দেওয়া বক্তব্যে সোহেল রানা একাধিকবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। ১ জুন আদালতে তিনি দাবি করেন, ডলার নামের এক ব্যক্তি শিশুটিকে ধর্ষণ করেছেন। নিজের নির্দোষিতা দাবি করে তিনি আদালতকে বলেন, তিনি হত্যা বা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নন এবং তার স্ত্রীও নির্দোষ। কিন্তু পরদিন ২ জুন আদালতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ডলার নামের ওই ব্যক্তির পাশাপাশি তিনিও কিছু অপরাধ করেছেন। ফলে তার বক্তব্যে অসঙ্গতি নিয়ে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষে সরকার নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ জানিয়েছেন, তার মক্কেলরা কখনোই ডলার নামের কোনো ব্যক্তির বিষয়ে তাকে কিছু জানাননি। তিনি আরও বলেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদনেও ডলার নামের কোনো ব্যক্তির উল্লেখ নেই। ফলে আদালতে আসামির দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটির দ্রুত অগ্রগতি বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর বিচার সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেবে। একই সঙ্গে এটি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের অঙ্গীকারকেও আরও দৃঢ় করবে।
এখন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত মামলার রায়ের দিন ঘোষণা করবেন। আলোচিত এই মামলার রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে নিহত শিশুর পরিবার, আইনজীবী মহল এবং পুরো দেশ।
SEO ট্যাগ: পল্লবী শিশু হত্যা মামলা, পল্লবী ধর্ষণ ও হত্যা, সোহেল রানা, স্বপ্না আক্তার, শিশু নির্যাতন, শিশু হত্যা, ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল, পল্লবী সংবাদ, আদালতের রায়, ধর্ষণ মামলা, বাংলাদেশ আদালত, শিশু নিরাপত্তা, আলোচিত মামলা, পল্লবী হত্যাকাণ্ড, অপরাধ সংবাদ, বিচার কার্যক্রম, ঢাকার খবর, ট্রাইব্যুনাল সংবাদ, আইন ও আদালত, বাংলাদেশ ক্রাইম নিউজ।