কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজহারুল ইসলাম। দেশের আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
আজহারুল ইসলাম বলেন, একটি রাষ্ট্রের আইন এমন হওয়া প্রয়োজন, যা মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে। মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা জরুরি। তার মতে, কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিধান সমাজে দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের মতামত, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আইন প্রণয়নের আগে সেটির সামাজিক প্রভাব, মানুষের অধিকার এবং দেশের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। আইন যেন নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
আজহারুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে হবে। ধনী-গরিব, প্রভাবশালী-সাধারণ—সব নাগরিকের জন্য আইনের প্রয়োগ সমান হওয়া প্রয়োজন।
তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে সমাজে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তার ভাষ্য, শুধু আইন করে অপরাধ ও অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। মানুষের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করাও জরুরি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে হবে।
দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে সেই মতপার্থক্য যেন সংঘাত, সহিংসতা কিংবা সামাজিক বিভাজনে পরিণত না হয়। দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতা থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবা আরও সহজে পেতে পারেন। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
আজহারুল ইসলাম বলেন, আইন প্রণয়নের সময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নাগরিক যেন ধর্ম, মত, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন—এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের দাবি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের একটি আলোচনার বিষয়। এ ধরনের বক্তব্যের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি দেশের সংবিধান, বিদ্যমান আইন, নাগরিক অধিকার এবং বহুত্ববাদী সমাজের বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় এসব বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
আজহারুল ইসলাম বলেন, দেশের আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা পান এবং তাদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে না; ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও একটি দেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে আইন প্রণয়নে সতর্কতা প্রয়োজন। যেসব আইন মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করবে এবং সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে, সেগুলোই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
সবশেষে আজহারুল ইসলাম কোরআন-সুন্নাহর মৌলিক নীতির আলোকে ন্যায়, সততা ও জনকল্যাণকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।