ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, করোনা ও হাম মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশকনিধন কার্যক্রম এবং হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালকে তাদের মোট শয্যার অন্তত ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সংরক্ষণ রাখতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের ভিজিট ফি ডেঙ্গু রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে না। রোগীদের শুধুমাত্র ওষুধ, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার খরচ বহন করতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। আবাসিক এলাকা, নির্মাণাধীন ভবন, খালি প্লট, ড্রেন, জলাবদ্ধ এলাকা এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো একযোগে এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লে যেন চিকিৎসা সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য হাসপাতালগুলোকে পর্যাপ্ত ফ্লুইড, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, দেশের সব হাসপাতালকে তিন দিনের মধ্যে তাদের মজুত পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। কোথাও ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত তা পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত চারজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। যদিও এই সংখ্যা খুবই কম, তবুও সরকার কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না। লক্ষ্য হচ্ছে ডেঙ্গু সংক্রমণকে যতটা সম্ভব শূন্যের কাছাকাছি রাখা। এজন্য আগাম প্রস্তুতি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে সমালোচনা রয়েছে, সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবহৃত ওষুধ ভারত থেকে আমদানি করা হয় এবং পরীক্ষাগারে এর কার্যকারিতা ও মান যাচাই করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক পাওয়া গেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে ওষুধের সঙ্গে কেরোসিন মিশিয়ে স্প্রে করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলায় শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বরং নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র এবং জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। সচেতনতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, “সরকার ব্যর্থ হলে দেশ ব্যর্থ হবে। তাই এই লড়াইয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। করপোরেট প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। করোনা ও হাম মোকাবিলার মতো ডেঙ্গুর বিরুদ্ধেও সম্মিলিতভাবে লড়াই করতে হবে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আশা করছে, আগাম প্রস্তুতি, সমন্বিত কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
ট্যাগ:
ডেঙ্গু, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সাখাওয়াত হোসেন, ডেঙ্গু রোগী, মশকনিধন কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বেসরকারি হাসপাতাল, ডেঙ্গু চিকিৎসা, স্যালাইন সংকট, জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবা, ডেঙ্গু সচেতনতা, বাংলাদেশ, সিটি করপোরেশন