Loading...

  • 26 Aug, 2026
সর্বশেষ

চট্টগ্রাম ডুবলে হাঁটু পানিতে নেমে মেয়র-এমপিদের নাটক আর দেখতে চাই না: সারজিস

চট্টগ্রাম ডুবলে হাঁটু পানিতে নেমে মেয়র-এমপিদের নাটক আর দেখতে চাই না: সারজিস

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও নগর অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। আগামী বর্ষার আগেই চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বর্ষাকালে জলাবদ্ধ এলাকায় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোক দেখানো কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেছেন।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোড এলাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সারজিস আলম। তিনি বলেন, বর্ষা এলেই নগরের বিভিন্ন এলাকা হাঁটু বা কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। এরপর জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পানিতে নেমে পরিস্থিতি দেখার দৃশ্য তৈরি হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে তিনি লোক দেখানো নাটক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আগামী বছর এমন দৃশ্য আর দেখতে চান না বলে মন্তব্য করেন।

সারজিস আলম বলেন, বর্ষা শেষ হওয়ার পর শরৎ, হেমন্ত ও শীত এলেই চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার বিষয়টি অনেকটা আড়ালে চলে যায়। পরবর্তী বর্ষায় আবার নগরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেলে মেয়র, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা কিংবা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পানিতে নেমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দৃশ্য দেখা যায়। কখনো কেউ নৌকা নিয়ে, আবার কেউ মাচা তৈরি করে মানুষের দুর্ভোগ দেখার চেষ্টা করেন। তার মতে, এসব দৃশ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে না।

তিনি বলেন, ‘বর্ষা এলেই হাঁটু বা কোমর পানিতে নেমে শুটিং করার যে নাটক দেখা যায়, ২০২৭ সালে তা আর দেখতে চাই না।’ একই সঙ্গে চট্টগ্রামের মেয়র, প্রশাসক, সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, লোক দেখানো কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার জন্য।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নগরী। দেশের আমদানি-রপ্তানি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বড় অংশ এই নগরীকে ঘিরে পরিচালিত হয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, সড়কের দুরবস্থা ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে না, এর প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন সারজিস।

তিনি বলেন, সরকারের হাতে প্রায় এক বছর সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। শুধু সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দেওয়া কিংবা বর্ষার সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল-নালা, সড়ক, পয়ঃনিষ্কাশন ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়কে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কের দুরবস্থার কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন সারজিস আলম। তিনি জানান, নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি তিনি ঘুরে দেখেছেন। অনেক সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ যে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তার ভাষায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার চেয়ে ঘরে বসে থাকাই ভালো মনে হতে পারে।

নগরের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নগরী হিসেবে চট্টগ্রাম পরিচিত হলেও এখানকার মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কেন ঢাকায় যেতে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। চট্টগ্রামবাসীর জন্য মানসম্মত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সারজিস আলমের মতে, একটি আধুনিক নগরের উন্নয়ন শুধু রাস্তা নির্মাণ বা জলাবদ্ধতা নিরসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নগরবাসীর মৌলিক প্রয়োজনগুলোকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন, পানি সরবরাহ ও পানি নিষ্কাশন—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি পৃথক মেগা পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তার মতে, আগামী বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে বর্ষাকালে নগরবাসীকে আবারও পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের একটি নাগরিক সমস্যা। অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের সময় নগরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হয় এবং শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

সারজিস আলম বলেন, চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী নয়, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলোর একটি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে লোক দেখানো কর্মকাণ্ডের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নগরের উন্নয়নকে রাজনৈতিক প্রচারের বিষয় না বানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

তিনি পানি নিষ্কাশন, সড়ক যোগাযোগ, পয়ঃনিষ্কাশন, পানি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিতভাবে উন্নয়নের আওতায় আনার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে আগামী বর্ষার আগেই দৃশ্যমান ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে সারজিস আলম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টিও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরার কথা জানান।