ভারতের গুজরাটে হৃদয়বিদারক এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে নিজের ২৩ বছর বয়সী ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তারই বাবা ও মায়ের বিরুদ্ধে। প্রথমে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করা হলেও পুলিশি তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। এরপর নিহত যুবকের স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ হত্যা মামলা দায়ের করে অভিযুক্ত বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন গুজরাটের রাজকোট জেলার গোন্ডাল তালুকের গুন্ডালা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত যুবকের নাম রাম বাবুবাই বামভাভা (২৩)। তার মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে তদন্তে অসঙ্গতি ধরা পড়ায় পুলিশ ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
তদন্তে জানা যায়, রাম দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মদ্যপানের সমস্যায় ভুগছিলেন। তার মদাসক্তিকে কেন্দ্র করে প্রায়ই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হতো। বিশেষ করে বাবা বাবুবাই ওরফে অতুলবাই ঘুগাবাই বামভাভা এবং মা মণীষাবেন ওরফে মোতিবেনের সঙ্গে তার নিয়মিত ঝগড়া-বিবাদ চলত।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিনও মদ্যপানকে কেন্দ্র করে পরিবারের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মা জোর করে রামের মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেন। একই সময় বাবা তাকে মারধর করার পাশাপাশি শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পেশায় চা বিক্রেতা বাবুবাই নিজের রাজনৈতিক পরিচিতদের ব্যবহার করে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, তিনি স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সহযোগিতা চেয়ে দ্রুত ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন, যাতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে।
তবে তদন্তে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। ময়নাতদন্তের বিস্তারিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা দেখতে পান, রামের শরীরে এমন আঘাতের চিহ্ন রয়েছে যা আত্মহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব এবং শ্বাসরোধ—এই দুই কারণ মিলেই তার মৃত্যু হয়েছে। এরপরই মামলার মোড় ঘুরে যায়।
ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিহতের স্ত্রী বংশীবেন বামভাভা থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। উল্লেখ্য, ঘটনার মাত্র চার মাস আগে রাম ও বংশীবেনের বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়ে তিনি শ্বশুর ও শাশুড়ির বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনেন।
স্ত্রীর লিখিত অভিযোগ এবং তদন্তে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে গোন্ডাল থানা পুলিশ হত্যা মামলা রুজু করে। এরপর অভিযুক্ত বাবা বাবুবাই ও মা মণীষাবেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, চার ভাইবোনের মধ্যে রাম ছিলেন সবার বড়। পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ এবং ঘটনার পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।