ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উত্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী Amir Khasru Mahmud Chowdhury। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল তিনটার দিকে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন তিনি।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’। এই প্রতিপাদ্যের আলোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ-সুবিধা দেশের সব অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো খাতের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দেশীয় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য ও ডিজিটাল করবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও বাজেটে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাবও থাকতে পারে। সরকারের মতে, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করা সম্ভব।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে লাইসেন্স, অনুমোদন এবং ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি সেবা একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন দাখিল, কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) Dr. Monjur Hossain বলেছেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের আশা, চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে এবং ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।