তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় তিস্তা ব্যারাজ ও তিস্তা-কেন্দ্রিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা এখন শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; বরং এটি দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে চীনের ইতিবাচক আগ্রহ এবং নীতিগত সমর্থনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সেচব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের উল্লেখযোগ্য আবাদযোগ্য জমি উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। তবে পর্যাপ্ত সেচের অভাবে কৃষির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি। কিন্তু উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা এখন শুধু একটি নদী নয়; এটি আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, পানি কূটনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক পানি আইনে আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে ‘ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার’ এবং ‘ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা’—এই দুটি নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। ফলে তিস্তার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফাভাবে নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও ২০১১ সালের প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক পানি চুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলে সারা বছর নির্ভরযোগ্য সেচ নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। এতে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়বে। একই সঙ্গে নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া নদীকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, ফল ও বনজ বৃক্ষের চাষ, পরিকল্পিত বসতি, নৌপর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশকে ভারত ও চীনের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে তিস্তা প্রকল্পকে সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, ন্যায্য পানির অধিকার এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের নীতি অনুসরণ করাই হবে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নই ত্বরান্বিত করবে না, বরং বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।