প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন না—পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে নতুন করে টানাপোড়েনের খবর সামনে এসেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ, বকেয়া অর্থ পরিশোধ এবং চুক্তির বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ভারতের আদানি পাওয়ারের সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি রয়েছে। ফলে সরবরাহের পরিমাণ, মূল্য, বিল পরিশোধ এবং চুক্তির শর্ত—এসব বিষয় দুই দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন না বলে জানানো হয়। এই ঘোষণার পরই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে আদানি পাওয়ারের অবস্থান এবং তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলেও বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের অন্যতম বিষয় হলো বিদ্যুতের দাম এবং বকেয়া বিল। বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হয় বাংলাদেশকে। কোনো সময়ে বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পাওনা অর্থের বিষয়টি সামনে তোলে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের মূল্য, চুক্তির শর্ত এবং সরবরাহের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেলে দেশের জাতীয় গ্রিডে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত উৎপাদন ও আমদানি প্রয়োজন হয়।
তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হলে সেটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে।
আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়েও অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে। চুক্তির মূল্য, কয়লার দাম, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং অন্যান্য শর্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য চুক্তিটি কতটা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করে বাজারদর, উৎপাদন ব্যয় ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়ে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। পাওনা অর্থ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চললেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারের দায়িত্বশীল মহল অবশ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন, আমদানি এবং জ্বালানি সরবরাহ—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর না করার ঘোষণা এবং এর পরপরই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আলোচনা—দুটি বিষয় একই সময়ে সামনে আসায় জনমনে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে সফর বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুৎ একটি কৌশলগত খাত। তাই প্রতিবেশী দেশের কোনো বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থ, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাওনা অর্থ পরিশোধ ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতাগুলোও যথাযথভাবে মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনার ফল কী হয় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতাও যাতে স্থিতিশীল থাকে, সে বিষয়েও নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর না করার ঘোষণার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে আদানি পাওয়ারকে ঘিরে যে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভারত-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘটনাকে সরাসরি একসূত্রে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা জরুরি।