দেশের দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে প্রি-কেস (মামলাপূর্ব) বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম ইতোমধ্যেই আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তার ভাষ্য, আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ও সহজে সমাধান পাচ্ছেন এবং নতুন মামলা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন, যা বিচারব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে, পাশাপাশি আদালতের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
তিনি বলেন, ২০টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রকল্প) প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বিভিন্ন আইনে মামলা দায়েরের সংখ্যা গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক আদালত আইনে নতুন মামলা প্রায় ৫১ শতাংশ, বণ্টন সংক্রান্ত মামলায় প্রায় ৬৭ শতাংশ, প্রিম্পশন মামলায় ৮৮ শতাংশ, যৌতুক নিরোধ আইনে ৬৮ শতাংশ এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনে প্রায় ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আদালতে নতুন মামলার প্রবাহ এভাবে কমতে থাকলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তিনি বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানান, যেসব মামলা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নিতে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যেই মামলাজট কমানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত লিগ্যাল এইড ও মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি জানাতে হবে, যাতে প্রান্তিক ও অসহায় জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা গ্রহণে উৎসাহিত হয়।
কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আগামী তিন মাসের মধ্যে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
এসময় আইনমন্ত্রী উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা (JICA), জিআইজেড (GIZ) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-এর সহযোগিতার প্রশংসা করেন। পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান 'জিরো টলারেন্স'।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেনের সভাপতিত্বে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লাসহ বিচার বিভাগ ও আইনজীবী সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল—এই ১০ জেলায় একযোগে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।