জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের কাফন ও দাফনের খরচ জোগাড় করতে ভিক্ষা করে পাওয়া সামান্য সামান্য অর্থ জমিয়ে রাখতেন এক বৃদ্ধ। প্রতিদিন মানুষের কাছে হাত পেতে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানোর বদলে ভবিষ্যৎ মৃত্যুর কথা ভেবে সঞ্চয় করতেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তার সেই সঞ্চয়ই কাজে এলো মৃত্যুর পর। নিজের কাফন ও দাফনের জন্য যে অর্থ তিনি জীবিত অবস্থায় জমিয়েছিলেন, সেই টাকাতেই সম্পন্ন হয়েছে তার শেষযাত্রার আয়োজন।
বৃদ্ধের জীবনের এই ঘটনা স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করেছে। জীবদ্দশায় অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করেও তিনি কারও ওপর নিজের শেষকৃত্যের বোঝা চাপাতে চাননি। তাই ভিক্ষা করে পাওয়া অর্থ থেকে অল্প অল্প করে টাকা আলাদা করে রাখতেন। তার কাছে প্রতিটি কয়েন বা নোটের মূল্য ছিল অনেক বেশি। দিনের শেষে হাতে থাকা সামান্য অর্থের একটি অংশ নিজের ভবিষ্যৎ কাফনের জন্য রেখে দিতেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃদ্ধের জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও কষ্টে ভরা। নিয়মিত কোনো আয় ছিল না। জীবিকার জন্য তাকে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হতো। কেউ খাবার দিতেন, কেউ দিতেন সামান্য অর্থ। সেই অর্থ দিয়েই কোনোভাবে দিন পার করতেন তিনি। তবে নিজের মৃত্যুর পর কী হবে, সেই চিন্তা তাকে সবসময় ভাবিয়ে তুলত। পরিবারের সদস্য বা স্বজনদের ওপর নির্ভর না করে নিজের শেষ প্রয়োজনটুকু নিজেই মেটানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
বৃদ্ধের মৃত্যুর পর তার জমানো টাকা বের হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে অর্থ তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কাফনের জন্য জমিয়েছিলেন, তা দিয়েই তার কাফন কেনা এবং দাফনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর অনেকেই বিস্মিত হন। কারণ জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজের জন্য কোনো আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা না করে একজন মানুষ মৃত্যুর পরের প্রয়োজনের কথাও এতটা গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছেন—এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না।
মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য সাহায্যকে তিনি নিজের শেষ সম্বল হিসেবে দেখতেন। তার এই সঞ্চয়ের মধ্যে ছিল একদিকে অসহায়ত্বের বাস্তবতা, অন্যদিকে আত্মনির্ভর থাকার প্রবল ইচ্ছা। জীবিত অবস্থায় তিনি হয়তো কারও কাছে বড় কোনো প্রত্যাশা রাখেননি। বরং নিজের মৃত্যুর পর যেন অন্য কাউকে অর্থের জন্য সমস্যায় পড়তে না হয়, সেই চিন্তা থেকেই টাকা জমিয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বৃদ্ধের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে তার জীবনের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেন। মানুষের কাছে হাত পেতে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়ে জীবন চালানো কতটা কঠিন, তার এই ঘটনাটি যেন সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর পরও নিজের প্রয়োজনের কথা ভেবে অর্থ সঞ্চয় করার বিষয়টি অনেককে আবেগাপ্লুত করেছে।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, অভাবের কারণে জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তাকে মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু নিজের কাফনের অর্থের জন্য তিনি অন্যের কাছে আলাদা করে হাত পাতেননি। বরং নিয়মিত পাওয়া ভিক্ষার টাকা থেকে কিছু অংশ জমিয়ে রেখেছেন। মৃত্যুর পর সেই অর্থই তার শেষ ইচ্ছার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃদ্ধের এই ঘটনা সমাজের আরেকটি কঠিন বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দেয়—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহায় মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের শেষ জীবনের নিরাপত্তা অনেক সময় নিশ্চিত থাকে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার বাইরে থাকা মানুষদের জন্য সামান্য সহযোগিতাও অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে। আর সেই অভাবের মধ্যেও বৃদ্ধ যেভাবে নিজের শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন, তা মানুষের মনে দীর্ঘদিন দাগ কাটবে।
জীবনের শেষ মুহূর্তে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় নিরাপদ আশ্রয়, সঙ্গ ও সম্মানের। কিন্তু এই বৃদ্ধের জীবনে সেই নিশ্চয়তা ছিল না। তাই ভিক্ষার টাকা থেকে কাফনের অর্থ জমিয়ে রাখাই হয়ে উঠেছিল তার শেষ ভরসা। মৃত্যুর পর সেই জমানো অর্থেই যখন তার দাফন সম্পন্ন হলো, তখন ঘটনাটি যেন এক অসহায় মানুষের নীরব সংগ্রামের করুণ পরিণতি হয়ে সামনে এলো।