ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের ভূখণ্ডে হামলা, হত্যা, অপহরণ এবং ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ তুলে একযোগে সতর্কবার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ মোট ২২টি দেশ। দেশগুলো যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে অবিলম্বে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দাবি জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে সংঘটিত হত্যাচেষ্টা, অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের হামলা জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষে অন্য দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা বা ষড়যন্ত্র পরিচালনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।
২২ দেশের অভিযোগ অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং এর বিদেশি অভিযান পরিচালনাকারী শাখা কুদস ফোর্স বিদেশে অবস্থানরত ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং ইহুদি ও ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত।
স্বাক্ষরকারী দেশগুলো দাবি করেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে সংঘটিত কয়েকটি হামলার ঘটনায় ইরানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বিদেশে বসবাসরত ইরানি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে প্রাণনাশের হুমকি ও হামলার পরিকল্পনার বিষয়টি তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব হুমকির বিরুদ্ধে নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে তারা ইরানকে সব ধরনের গোপন অভিযান, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সহিংস কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইহুদি সম্প্রদায়, ইরানি বিরোধী গোষ্ঠী এবং মার্কিন সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে সংঘটিত কিছু হামলার দায় ইরান-সমর্থিত সংগঠন ‘হারাকাত আশাব আল-ইয়ামিন আল-ইসলামিয়া’ স্বীকার করেছে। এর ফলে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
এর আগে অস্ট্রেলিয়া ইরানের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান গ্রহণ করে। গত বছরের আগস্টে দেশটি ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে এবং অভিযোগ তোলে যে, অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরে অন্তত দুটি ইহুদিবিদ্বেষী হামলার পেছনে তেহরানের নির্দেশনা ছিল। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়া তেহরান থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে এবং দূতাবাসের কার্যক্রমও স্থগিত করে।
পরে নভেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। এই পদক্ষেপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আলবেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, বুলগেরিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, উত্তর মেসিডোনিয়া, নরওয়ে, পর্তুগাল এবং সুইডেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন যৌথ বিবৃতি ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ইরান এ অভিযোগগুলো কীভাবে মোকাবিলা করে এবং তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।