ভারতের প্রভাবশালী বাংলা সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’-কে দেওয়া এক দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পররাষ্ট্রনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক, বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রাষ্ট্রচেতনা ও ঐতিহাসিক অবস্থানকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, বর্তমান সরকারের সময়ে বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের প্রতি অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রকে পাকিস্তানি রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাবের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া এক বিষয় নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর পাশাপাশি পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে পুনরায় সক্রিয় করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তার মতে, সামরিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানমুখী চিন্তাধারার দিকে ঠেলে দেওয়ার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তান এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে কি না কিংবা যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে কি না। তার মতে, এসব মৌলিক প্রশ্নের সমাধান ছাড়াই সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উদ্যোগ উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ গভীরভাবে জড়িত। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনার যে কোনো প্রচেষ্টা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সাক্ষাৎকারে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি দাবি করেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য খুবই সীমিত এবং অতীতে বিএনপির হাত ধরেই জামায়াত বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যারা মনে করেছিলেন বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের প্রভাব কমবে, তারা রাজনৈতিক বাস্তবতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেননি। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ দুর্বল হয়েছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে উদ্বেগজনক কিছু ঘটনা ঘটছে, যা একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য শুভ লক্ষণ নয়। তিনি দাবি করেন, পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি, প্রশাসন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে তার মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় সহনশীলতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর।
সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নত হলে তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হবে কি না। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তার রাজনৈতিক অবস্থান কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বাংলাদেশের জনগণের ওপরই নির্ভরশীল।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায়। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কখনও আপস করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক টেকসই রাখতে হলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা জরুরি। এসব ভিত্তি দুর্বল হলে কূটনৈতিক সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাক্ষাৎকারজুড়ে শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে আপসহীন থাকার আহ্বান জানান।