বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য কমিয়ে উভয় ধারার কারিকুলামে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ববি হাজ্জাজ। শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ও সমতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে দুই মাধ্যমের পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি দৃশ্যমান ব্যবধান রয়েছে। একই দেশের শিক্ষার্থীরা ভিন্ন মাধ্যমে পড়াশোনা করলেও তাদের শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য, জ্ঞান অর্জনের সুযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়। তাই আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুই মাধ্যমের কারিকুলামের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়, বরং যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, দেশ ও সমাজ সম্পর্কে ধারণা এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কোন মাধ্যমে পড়ছে, সেটি যেন তাদের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য তৈরি না করে।
ববি হাজ্জাজ আরও বলেন, বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের যেমন আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকতে হবে, তেমনি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদেরও দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকতে হবে। দুই ধারার শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন করলেই হবে না বলেও মত দেন তিনি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা উপকরণের মানোন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বিষয় বুঝে শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক কারিকুলাম ও বিভিন্ন অতিরিক্ত শিক্ষার সুযোগ পেলেও বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ সীমিত সুযোগের মধ্যে পড়াশোনা করে। আবার ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে যুক্ত থাকার সুযোগ পায় না। ফলে দুই ধারার ইতিবাচক দিকগুলো সমন্বয় করে একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ববি হাজ্জাজের বক্তব্যে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। একটি সমন্বিত কারিকুলাম শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার জন্য সমান ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কারিকুলামে সামঞ্জস্য আনার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দুই মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন, শিক্ষাপদ্ধতি ও বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করা হলে তা আরও কার্যকর হতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের সব শিক্ষার্থীকে একই ধরনের মৌলিক জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ অর্জনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাও তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্যাগ: