Loading...

  • 26 Jul, 2026

বাজেটে ‘যাকাত’ শব্দ নেই, সুদভিত্তিক অর্থনীতি বাতিলের দাবি জামায়াত এমপির

বাজেটে ‘যাকাত’ শব্দ নেই, সুদভিত্তিক অর্থনীতি বাতিলের দাবি জামায়াত এমপির

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ‘যাকাত’ শব্দের উল্লেখ না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে দেশে যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালুর দাবি জানান। একই সঙ্গে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, মদ ও তামাকজাত পণ্য নিষিদ্ধকরণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণের আহ্বান জানান তিনি।

রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব বক্তব্য দেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, বিজয়ের পর আল্লাহর প্রশংসা করা এবং নিজের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে অনেকেই আল্লাহর প্রশংসার পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের প্রশংসায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার অপচয় কমানোর কথা বললেও বাজেটে যাকাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছে। তার মতে, নামাজ ও যাকাত সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করে এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, “যাকাত শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। সঠিকভাবে যাকাত আদায় ও বণ্টন করা গেলে দেশের দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”

সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সুদ অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তিনি দাবি করেন, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং ও শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

তিনি প্রস্তাব করেন, দেশে একটি স্বতন্ত্র ‘যাকাত মন্ত্রণালয়’ বা জাতীয় যাকাত কমিশন গঠন করা যেতে পারে। সেখানে বিভিন্ন ধারার আলেমদের অন্তর্ভুক্ত করে যাকাত আদায় ও বণ্টনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তার দাবি, সঠিকভাবে যাকাত আদায় করা গেলে বছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব, যা বাজেট ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগেরও কড়া সমালোচনা করেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থকে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে বৈধ করার নীতি সমাজে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে। তাই বাজেটে এ ধরনের সুযোগ রাখা উচিত নয় বলে মত দেন তিনি।

একই সঙ্গে দেশে মদ, বিড়ি, সিগারেট ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তিনি। তার মতে, এসব পণ্যের কারণে জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামাজিক সমস্যা বাড়ছে।

শিক্ষা খাত নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি কওমি মাদ্রাসার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় এবং সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্যও পোশাক ও জুতার সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এছাড়া তিনি শিক্ষকদের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থা ধাপে ধাপে জাতীয়করণের দাবি জানান। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি, সেগুলোকে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত করারও প্রস্তাব দেন।

শ্রমিকদের অধিকার প্রসঙ্গে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করার নীতি বাস্তবায়ন করা উচিত। পাশাপাশি বেকারত্ব কমানো এবং দারিদ্র্য দূর করতে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

নিজ নির্বাচনী এলাকার স্বাস্থ্যসেবার সংকট তুলে ধরে তিনি জানান, স্থানীয় হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্স নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার জন্য তিনি স্পিকারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

মসজিদে রাজনীতি করা যাবে না— এমন মতের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার মতে, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয় পর্যায়ে দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।