আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা বহুল আলোচিত ‘কালো টাকা’ বিনিয়োগের সুযোগ আবারও চালু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার আওতায় করদাতারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পূর্বে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধভাবে ঘোষণা করতে পারবেন। বিনিময়ে তাদের প্রচলিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর বা জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। তবে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো সরকারি সংস্থা প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জমি বা স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলে উল্লেখিত মূল্যের চেয়ে প্রকৃত লেনদেনমূল্য বেশি হলে সেই অতিরিক্ত অর্থ প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হবে। এই সুবিধা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই গ্রহণ করতে পারবেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আগে অপ্রদর্শিত থাকা অর্থের ওপর করদাতাকে প্রচলিত আয়কর হার অনুযায়ী কর দিতে হবে। ব্যক্তিগত করদাতাদের ক্ষেত্রে এ হার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে প্রদেয় করের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ হারে জরিমানা বা অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো সম্পত্তির দলিল মূল্য যদি ৫০ লাখ টাকা হয় কিন্তু প্রকৃত লেনদেনমূল্য ৩ কোটি টাকা হয়ে থাকে, তাহলে দলিলমূল্যের বাইরে থাকা অর্থ করদাতা পরবর্তীতে ঘোষণা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর ও অতিরিক্ত ২০ শতাংশ জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। একবার অর্থ ঘোষণা করা হলে তার উৎস নিয়ে কোনো সংস্থা তদন্ত বা প্রশ্ন করতে পারবে না।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, শুধু অতীতের লেনদেন নয়, ভবিষ্যতেও একই নিয়মে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রকাশের সুযোগ রাখা হতে পারে। সরকারের ধারণা, এর ফলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসবে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তাদের মতে, সাধারণ করহার বহাল রেখে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ খুব বেশি বাড়বে না। কারণ করদাতাদের জন্য এতে বিশেষ কোনো আর্থিক সুবিধা থাকছে না।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস বলেন, দলিল মূল্যের সঙ্গে যুক্ত প্রচলিত করহার অনুযায়ী কর আরোপ করলে অধিকাংশ মানুষ অপ্রদর্শিত অর্থ প্রকাশে আগ্রহী হবেন না। তবে নির্দিষ্ট ও তুলনামূলক সহজ করহার নির্ধারণ করা হলে এবং অর্থের উৎস নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন না তোলার নিশ্চয়তা দেওয়া হলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এই ধরনের দায়মুক্তির বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, অর্থের উৎস যাচাই ছাড়াই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলে তা কর ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে এবং সৎ করদাতাদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য (আয়কর নীতি) সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, যেকোনো প্রক্রিয়ায় অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। এতে বৈধ উপায়ে কর পরিশোধকারী নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, অর্থের উৎস অনুসন্ধান ছাড়া দায়মুক্তি দেওয়া হলে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থও অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। ফলে অর্থ পাচার, দুর্নীতি বা অন্যান্য অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বৈধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের যুক্তি হলো, দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা অর্থকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার জন্য বাস্তবমুখী ব্যবস্থা প্রয়োজন। আবাসন খাত দেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগ খাত হওয়ায় এখানে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে এই বিধান চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হলে তা অর্থনীতি, করনীতি এবং আবাসন খাতে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।