জানা গেছে, ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে তার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে করে মরদেহ বহনকারী বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা ও কাগজপত্র যাচাই শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ মুন্সিগঞ্জে নিয়ে যান, যেখানে তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
নিহত মোহাম্মদ শ্রাবন মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বকুলতলা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মোহাম্মদ নলি মিয়ার ছেলে। জীবিকার তাগিদে প্রায় এক দশক আগে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকে পাড়ি জমান। সেখানে রাজধানী বাগদাদে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে পরিবার চালাতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে আসছিলেন তিনি।
সম্প্রতি ইরাকের বাগদাদে চলমান অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধকালীন সময়ে নিক্ষিপ্ত একটি মিসাইলের আঘাতে প্রাণ হারান শ্রাবন। হঠাৎ এই মর্মান্তিক ঘটনায় তার পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। দেশে থাকা স্বজনরা প্রথমে তার মৃত্যুর সংবাদ বিশ্বাসই করতে পারেননি। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, একজন প্রবাসী বাংলাদেশির এমন করুণ মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি নিহতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাগদাদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে মরদেহ দেশে পাঠানোর সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসের কর্মকর্তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জানা গেছে, গত ২৭ মে সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর TK0843-এ মরদেহটি তুরস্কের উদ্দেশে পাঠানো হয়। পরে প্রায় ২৯ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রানজিট শেষে আরেকটি ফ্লাইট, TK0712-এ করে শুক্রবার সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছায়।
বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের সময় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, প্রবাসী কল্যাণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং নিহতের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে দাফন-কাফনের খরচ হিসেবে শ্রাবনের পরিবারের হাতে ৩৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা তুলে দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রাবনের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। গ্রামের মানুষজন তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল শ্রাবনের। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই না ফেরার দেশে চলে যেতে হলো তাকে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় আক্রান্ত দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অনেক সময় তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যেই কাটাতে হয়। শ্রাবনের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মাঝে গভীর শোক নেমে এসেছে।