দেশজুড়ে চলমান হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাবের পর থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫২ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে চার শিশুর মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগের একজন করে রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু এবং তাদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত টিকাদানের আওতায় ছিল না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫৬০ শিশু। অন্যদিকে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৯২ জন। এই দুই শ্রেণির মৃত্যুর হিসাব মিলিয়ে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৬৫২ জনে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু মৃত্যুই নয়, আক্রান্তের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৫২ জনের শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৮৫ হাজার ৯৫১ জনে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গত একদিনে ৭৫ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম রোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩২৩ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি এবং গ্রামীণ এলাকাগুলোতে সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭০ হাজার ৫৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৬ হাজার ৮৪১ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। যদিও উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে, তবুও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে যে দ্রুত চিকিৎসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার ফলে নিশ্চিত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও সময়মতো টিকা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। একই সঙ্গে জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশব্যাপী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবুও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্য খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্যাগ:
হাম, হাম রোগ, হামের প্রাদুর্ভাব, শিশুমৃত্যু, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাত, সংক্রামক রোগ, টিকাদান কর্মসূচি, শিশু স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য, হাসপাতাল ভর্তি, স্বাস্থ্য সংবাদ, বাংলাদেশ, রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সতর্কতা