দক্ষিণ ফিলিপাইনে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১৯ জনে পৌঁছেছে। দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন মুখপাত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ এখনও নিহতের সংখ্যা যাচাই-বাছাই ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। ফলে চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশের আগে এই সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার (৮ জুন) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের ঘটনায় অন্তত সাতজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ১৩৪ জনেরও বেশি মানুষ। উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফিলিপাইনের সরকারি ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটি দেশের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে উৎপন্ন হয়েছে। Philippine Institute of Volcanology and Seismology (PHIVOLCS) জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর অবস্থান কোটাবাটো ট্রেঞ্চের কাছাকাছি, যা দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টিকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক খাদ হিসেবে পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর ভূত্বকের টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়ার ফলে এই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছে। ফিভোলকসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমুদ্রতলের নিচে একটি টেকটোনিক প্লেট অন্য একটি প্লেটের নিচে সরে যাওয়ার সময় সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে যায়, যার ফলেই এই শক্তিশালী কম্পনের উৎপত্তি ঘটে। এমন ধরনের ভূমিকম্প সাধারণত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
ভূমিকম্পের পর বহু বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফিলিপাইন বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিখ্যাত Ring of Fire বা ‘অগ্নিবলয়’-এর ওপর অবস্থিত। এই অঞ্চলে পৃথিবীর বেশিরভাগ সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এবং ভূমিকম্প উৎপাদনকারী ফল্টলাইন রয়েছে। ফলে ফিলিপাইনে প্রায় প্রতিবছরই অসংখ্য ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যদিও অধিকাংশ কম্পন তেমন ক্ষতির কারণ হয় না, তবে কিছু কিছু ভূমিকম্প বড় ধরনের প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনে।
সাম্প্রতিক এই দুর্যোগ দেশটির অতীতের ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মধ্য ফিলিপাইনের ভিসায়াস অঞ্চলে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। একই বছর মিন্দানাওয়ের উপকূলীয় এলাকায় সংঘটিত আরও দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত আটজন প্রাণ হারান।
এদিকে এই ভূমিকম্পের প্রভাব শুধু ফিলিপাইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কম্পনের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত North Sulawesi অঞ্চলেও তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। বিশেষ করে Sangihe Islands Regency এলাকায় কিছু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করছে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে বড় ভূমিকম্পের পর আফটারশক বা পরাঘাতের ঝুঁকি থাকে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।