Loading...

  • 10 Jun, 2026

রোহিঙ্গা শিবিরে ঈদের আনন্দ ম্লান, কোরবানির মাংসের অপেক্ষায় লাখো মানুষ

রোহিঙ্গা শিবিরে ঈদের আনন্দ ম্লান, কোরবানির মাংসের অপেক্ষায় লাখো মানুষ

কোরবানির ঈদ মানেই আনন্দ, আত্মত্যাগ আর পরিবারের সঙ্গে উৎসব ভাগাভাগির সময়। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ঈদের সেই চেনা আনন্দ যেন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরে বসবাস করা লাখো রোহিঙ্গার কাছে ঈদ এখন শুধুই অতীত স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস।

 মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিজেদের ঘরবাড়ি, জমিজমা আর স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে পালিয়ে আসা এই মানুষগুলোর জীবনে উৎসবের আনন্দের জায়গা দখল করেছে অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার লেদা আশ্রয়শিবিরে গেলে দেখা যায়, সরু গলির দুই পাশে ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। সেখানে কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী ঈদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। তাদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছিল কোরবানি দিতে না পারার কষ্ট আর মিয়ানমারে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি। একসময় যেসব পরিবার ঈদ উপলক্ষে রাতভর পিঠা তৈরি করত, প্রতিবেশীদের দাওয়াত দিত এবং নিজেরা গরু কোরবানি দিত, আজ তারা এক কেজি মাংস পাওয়ার আশায় দিন গুনছে।

রোহিঙ্গা নারী রহিমা খাতুনের মতো অনেকেই বলছেন, দেশে থাকাকালে ঈদের আগে বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। নারীরা চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা বানাতেন, পুরুষেরা পশু কেনার প্রস্তুতি নিতেন। এখন সেই ব্যস্ততা নেই, আনন্দও নেই। আশ্রয়শিবিরের সংকীর্ণ জীবনে ঈদ যেন কেবল একটি দিন মাত্র। তাদের ভাষায়, “মাংসও নেই, আনন্দও নেই, শুধু বেঁচে আছি।”

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে রয়েছে আড়াই লাখের বেশি পরিবার। এবারের ঈদুল আজহায় তাদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ পরিবারকে এক কেজি করে কোরবানির মাংস দেওয়া হবে। বিভিন্ন এনজিও এবং মানবিক সংস্থার সহায়তায় প্রায় দুই হাজার গরু-ছাগল কোরবানি দিয়ে এই মাংস বিতরণ করা হবে। যদিও কয়েক বছর আগেও রোহিঙ্গাদের জন্য পাঁচ থেকে ছয় হাজার পশু কোরবানি দেওয়া হতো। অর্থসংকট ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এখন সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, ক্যাম্প ইনচার্জদের তত্ত্বাবধানে মাঝিদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে মাংস পৌঁছে দেওয়া হবে। ঈদের দিন সকালে পশু জবাইয়ের পর দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করা হবে এবং পশুর চামড়া বিভিন্ন এতিমখানায় বিতরণ করা হবে। তবে বাস্তবতা হলো, এত বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই সহায়তা খুবই সীমিত। অনেক পরিবার হয়তো সামান্য মাংস পাবে, কিন্তু ঘরে রুটি বা অন্যান্য খাবার জোগাড় করতে পারবে না। আবার কারও কাছে রুটি থাকবে, কিন্তু মাংস থাকবে না।

তবুও কিছু পরিবার আত্মীয়স্বজনের পাঠানো টাকায় কোরবানির পশু কিনতে পেরেছে। কেউ কেউ বিদেশে থাকা স্বজনদের সহায়তায় কয়েকটি পরিবার মিলে গরু কিনছেন। লেদা ক্যাম্পের আবদুর শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এক রোহিঙ্গা আত্মীয়ের পাঠানো টাকায় আটটি পরিবার মিলে একটি গরু কিনেছেন। ঈদের দিন সেই গরুর মাংস ভাগাভাগি করে খাবেন তারা। আবার কেউ সাত-আট পরিবার মিলে ছোট একটি গরু কিনে কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। কাজের সুযোগ না থাকায় তাদের আয় করার কোনো উপায় নেই। ফলে ঈদের মতো উৎসবও তাদের কাছে এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা বিদেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে কিছু টাকা পান, তারাই কেবল সামান্য আয়োজন করতে পারেন। বাকিরা নির্ভর করেন ত্রাণ ও সহায়তার ওপর।

সব মিলিয়ে এবারের ঈদও রোহিঙ্গা শিবিরে কাটবে সীমাহীন কষ্ট আর স্মৃতির ভার নিয়ে। কোরবানির ঈদ তাদের জন্য আনন্দের নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া জীবনের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার আরেকটি দিন।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy