দেশে দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার, কিডনি জটিলতা, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকজনিত পক্ষাঘাত, জন্মগত হৃদরোগ এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো গুরুতর ও ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এক বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব রোগের চিকিৎসা শুধু দীর্ঘমেয়াদি নয়, একইসঙ্গে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে সরকার নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ কিস্তিতে সরকার মোট ৪৯ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা দেশের ৬৩ জেলার মোট ৯ হাজার ৮৮৯ জন রোগীর মধ্যে বিতরণ করা হবে। এই অর্থ বিতরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ভাতা, অনুদান ও চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, এই সহায়তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো এমন রোগীদের পাশে দাঁড়ানো, যারা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে অক্ষম। অনেক সময় দেখা যায়, ক্যান্সার বা কিডনি রোগে আক্রান্ত একজন রোগীর পরিবার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে গিয়ে জমি-জমা বিক্রি করে, ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে কিংবা চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। এই অবস্থায় সরকারি সহায়তা অনেক পরিবারকে বাঁচার নতুন পথ দেখায়।
জেলা ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের কিস্তিতে চট্টগ্রাম জেলায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখানে ৬২৫ জন রোগীর জন্য ৩ কোটি ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, বগুড়া, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী এই সহায়তার আওতায় এসেছে। একই সঙ্গে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলাতেও এই অর্থ বিতরণ করা হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির মতো দুর্গম এলাকার রোগীরাও এই সহায়তার বাইরে নয়। এসব অঞ্চলের অনেক মানুষ স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকলেও সরকার তাদের জন্যও বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করেছে, যাতে তারা চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি আবেদন কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদন করা হয়, যাতে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা এই সহায়তা পান। অনেক সময় রোগীরা দেরিতে আবেদন করেন, ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। তাই রোগ শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সহায়তার জন্য আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করতে হবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়ী থাকবেন। এছাড়া ৩০ জুনের মধ্যে এই অর্থ ব্যয় সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচি দেশের দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের জন্য একটি বড় ধরনের স্বস্তি ও আশার বার্তা বহন করছে। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং অনেক পরিবারের জন্য জীবন বাঁচানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সরকারের এই পদক্ষেপ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে এবং স্বাস্থ্যসেবায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।