Loading...

  • 10 Jun, 2026

দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমার লক্ষণ নেই, প্রতি সপ্তাহে গড়ে মারা যাচ্ছে ৫৭ শিশু

দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমার লক্ষণ নেই, প্রতি সপ্তাহে গড়ে মারা যাচ্ছে ৫৭ শিশু

দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও কমার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং আক্রান্ত ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রোগটির প্রাদুর্ভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চমাত্রায় অব্যাহত রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত হাম এবং হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে ৫৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫৭ জনেরও বেশি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। সর্বশেষ সপ্তাহে, অর্থাৎ ১৮ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৫৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। এরপর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে থাকে। তবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার প্রত্যাশিতভাবে কমেনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৬ মে প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা কিছুটা কমলেও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে মৃত্যুর হারও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, একদিনে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৩২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো মহামারী বা সংক্রামক রোগের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য শুধু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা নয়, মৃত্যুর হারও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, নজরদারির ঘাটতি কিংবা তথ্য সংগ্রহে দুর্বলতার কারণে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় না। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা সাধারণত বাস্তব পরিস্থিতির একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র তুলে ধরে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাজ্যের কেইল ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হায়দার বলেন, সংক্রমণের গতি বোঝার ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রবণতা অন্যতম নির্ভরযোগ্য সূচক। বর্তমানে বাংলাদেশে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৩৬ জন। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ৮ হাজারে পৌঁছে যায়। এরপর এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করে। কোনো কোনো সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজারেরও বেশি ছিল। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহেও প্রায় ১০ হাজার মানুষের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, সময়মতো হাম প্রতিরোধী টিকা না পাওয়া, শিশুদের অপুষ্টি, ভিটামিন-এ ক্যাপসুল কর্মসূচির দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্যসেবার কিছু সীমাবদ্ধতা।

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার গত ৫ এপ্রিল বেশি আক্রান্ত ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। পরে ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে দেশের প্রায় সব জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন মনে করেন, শুধু টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, পুষ্টি সহায়তা এবং কার্যকর রোগ ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার প্রচলিত কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে।

এদিকে ঈদুল আজহার ছুটিকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষ রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় গেছেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মানুষের এই ব্যাপক চলাচল সংক্রমণ আরও বিস্তৃত করতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনো সংক্রমণ তুলনামূলক কম, সেখানে নতুন করে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, সংক্রমণের এই সময়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি রোগ ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy