বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাগুরা জেলা আমির এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-২ আসনের দলীয় প্রার্থী অধ্যাপক এম বি বাকেরকে দ্বিতীয়বারের মতো জেলা আমিরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার রুকনিয়াত (সদস্যপদ) তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
শুক্রবার (১২ জুন) সকালে মাগুরা জেলা জামায়াতের দোয়ারপাড় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা শুরা ও কর্মপরিষদের এক যৌথ সভায় এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। সভায় যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মুবারক হোসেন উপস্থিত থেকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি তুলে ধরেন।
এ সময় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও শ্রীপুর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. আলমগীর বিশ্বাস এবং যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল টিম সদস্য আব্দুল মতিনসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় দলীয় শৃঙ্খলা, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং অভিযোগসমূহের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী, অধ্যাপক এম বি বাকেরকে জেলা আমিরের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার রুকনিয়াত তিন মাসের জন্য মূলতবি করা হয়েছে। এই সময়ে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত থাকবে এবং অভিযোগগুলোর তদন্ত কার্যক্রম চলবে।
একই সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আহমেদ বাচ্চুকে ভারপ্রাপ্ত জেলা আমির হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সহকারী অধ্যাপক মশিয়ার রহমানকে ভারপ্রাপ্ত জেলা সেক্রেটারির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নেতৃত্বে জেলার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছে দল।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এটি প্রথমবার নয়। এর আগেও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একটি আলোচিত ঘটনায় অধ্যাপক এম বি বাকেরকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় হত্যা মামলার আসামি এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার পক্ষে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করেছিল। সেই ঘটনায় তাকে এক মাসের জন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে নতুন করে একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সংগঠন পরিচালনায় বৈষম্যমূলক আচরণ, প্রশাসনিক অনিয়ম, আর্থিক অস্বচ্ছতা, অর্থ তসরুফ, দলীয় তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এসব অভিযোগ নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেন।
অভিযোগকারীরা দাবি করেন, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জেলা জামায়াত পরিচালিত হচ্ছিল এবং নির্বাচনি তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়েছে। এছাড়া সালিশ বাণিজ্য, চাকরি বাণিজ্য, জমি ক্রয়-বিক্রয়ে আর্থিক অনিয়ম এবং স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, সঞ্চয়পত্রে অর্থ বিনিয়োগসহ সুদভিত্তিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং মতবিরোধের কারণে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়গুলোও তদন্তাধীন রয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্ত টিম এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করছে।
জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা হবে না। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অধ্যাপক এম বি বাকেরের বিরুদ্ধে স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে অধ্যাপক এম বি বাকেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তাকে জেলা আমিরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং তার রুকনিয়াত তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।
মাগুরা জেলা জামায়াতের এ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এখন তদন্তের ফলাফল এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন দলীয় নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
ট্যাগ:
মাগুরা, জামায়াতে ইসলামী, এম বি বাকের, মাগুরা জেলা জামায়াত, জেলা আমির, রুকনিয়াত স্থগিত, জামায়াত রাজনীতি, ডা. শফিকুর রহমান, সাংগঠনিক ব্যবস্থা, দুর্নীতির অভিযোগ, আর্থিক অনিয়ম, দলীয় তদন্ত, মাগুরা-২ আসন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সাঈদ আহমেদ বাচ্চু, মশিয়ার রহমান, বাংলাদেশ রাজনীতি, দলীয় শৃঙ্খলা, জামায়াত সংবাদ, রাজনৈতিক খবর