কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ অপ্রতিমের বাবার মোবাইল সরঞ্জামাদির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতেন। ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে তিনি কাজে যোগ দেন। তবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর এখনো তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্র করা হয়নি বলে জানিয়েছেন অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে তিনি জানান, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে তার মোবাইল সরঞ্জামাদির শোরুম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘ইয়েসটেক’। অপ্রতিমের পরিবারের বাসা কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায়। ফাহাদও একই এলাকার কাছাকাছি বসবাস করতেন।
অপ্রতিমের বাবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফাহাদ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর মেম্বার বাড়ি এলাকার মমিন হোসেন ও জুলি আক্তারের ছেলে। তার বাবা অটোচালক। বাবা-মায়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর তাকে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মাস শেষে তার সঙ্গে চুক্তিপত্র করার পরিকল্পনা ছিল বলে জানান কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার।
তিনি বলেন, চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর অপ্রতিম ও ফাহাদের মধ্যে বিশেষ কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়নি। দুজনের মধ্যে স্বাভাবিক পরিচয় থাকলেও উল্লেখ করার মতো কোনো বিরোধ বা ঘনিষ্ঠতাও ছিল না। অপ্রতিম ফাহাদকে খারাপ মনে করত না বলেও জানান তার বাবা।
তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রথমে তুহিন অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। এরপর ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান (১৬) তাকে আঘাত করেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়।
তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। পুলিশ জানতে পেরেছে, ফাহাদ অপ্রতিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। সম্প্রতি সেই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য অপ্রতিমকে চাপ দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে ফাহাদের মধ্যে অপ্রতিমের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের দিন শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে অপ্রতিম আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয়। তার আগে জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে খাবার খায়। পরে তুহিন মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে তাকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন অপ্রতিমের বাবা।
সন্ধ্যার পরও অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তার বাবা ফাহাদকে ফোন করে ডেকে আনেন। অপ্রতিম কোথায় গেছে, তা খুঁজে বের করার জন্য ফাহাদকে সঙ্গে নেওয়া হয়। তখন ফাহাদ তাদের ইন্টারনেট গ্রুপে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানায়।
এরই মধ্যে অপ্রতিমের পরিবারের হাতে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ আসে। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা একজনকে দেখে ফাহাদ তাকে তুহিন হিসেবে শনাক্ত করেন। পরে ফাহাদকে তুহিনকে ফোন করে অপ্রতিমকে দেখেছে কি না এবং সে কোথায় গেছে, তা জানতে বলা হয়। রাত ১০টার দিকে ফোনে তুহিন অপ্রতিম তার কাছে আসেনি বলে জানায়।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ওই সময়ের আগেই অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল।
পরদিন শনিবার সকালে তুহিন ও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার সিয়াম (১৯) মোটরসাইকেলে করে অপ্রতিমের বাসায় যান। তারা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং সান্ত্বনাও দেন। পুলিশের ধারণা অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়।
অপ্রতিমের বাবা জানান, শনিবার সকালে তুহিনকে স্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা গেলেও তার সঙ্গে থাকা সিয়াম বিভিন্ন প্রশ্নে কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখান। পরে শনিবার দুপুরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর ফাহাদকে পরিবারের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যেতে বলা হলে শরীর খারাপ লাগছে বলে সে সেখান থেকে চলে যায়।
পুলিশ জানায়, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ, মো. কামরুল হাসান এবং সিয়াম। এর মধ্যে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিয়ামকে সন্দেহভাজন অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বয়স কম হওয়ায় ফাহাদ ও কামরুলকে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার তুহিনের বয়স ১৯ বছর। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা ছেড়ে দেন। কামরুলের বয়স ১৬ বছর। অন্যদিকে সিয়ামের বয়স ১৯ বছর এবং তিনি দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুক্রবার বিকেল আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে যান।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ফুটেজে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে তাকে ওই এলাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে জানান পুলিশ সুপার।
তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে ফাহাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কামরুলকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অপ্রতিম এতে বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার আইফোন নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলকে সঙ্গে করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পেছনে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং পাঁচ হাজার টাকা ধারসংক্রান্ত বিরোধ—দুই বিষয়ই তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।