দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদের ওপর আদালতের জব্দাদেশ থাকলেও সেগুলোর বড় অংশ এখনো কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফলে কাগজে-কলমে সম্পদ জব্দ থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা এখনও সেসব সম্পদের সুবিধা ভোগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। আদালতের আদেশে ৬ হাজার ১৩৭ কোটির বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হলেও অধিকাংশ সম্পদের ক্ষেত্রে এখনো রিসিভার নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি।
সূত্র জানায়, রাজধানীর গুলশান এলাকার একটি বহুতল ভবনে অবস্থিত একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে আদালতের জব্দাদেশ থাকলেও সেখানে এখনও রিসিভার নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে সেগুনবাগিচা এলাকায় থাকা আরও একটি সম্পত্তির ক্ষেত্রেও জব্দের নির্দেশ কার্যকর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, জব্দ হওয়া সম্পদের মধ্যে সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পত্তিও রয়েছে। তবে রিসিভার নিয়োগ না হওয়ায় এসব সম্পদ থেকে আয়-ব্যয়ের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না।
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর অনুসন্ধান কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে রিসিভার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা রয়েছে।
দুদকের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম বলেন, সম্পদের মালিকানা, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। লোকবল সংকট ও দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত গতিতে কাজ এগোচ্ছে না।
তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম। তার মতে, শুধুমাত্র জনবল সংকট নয়, কার্যকর উদ্যোগ ও তদারকির অভাবও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সম্পদের আয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কথা থাকলেও যথাসময়ে রিসিভার নিয়োগ না হওয়ায় অভিযুক্তরাই অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা ভোগ করছেন।
তবে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তির সম্পত্তিতে রিসিভার নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আয় জমা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের জব্দাদেশ কার্যকর বাস্তবায়ন, সম্পদের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব নিশ্চিত করতে দুদকের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত রিসিভার নিয়োগের ব্যবস্থা না করলে জব্দকৃত সম্পদ থেকে রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাবে না।