Loading...

  • 26 Jul, 2026

ডিসি সারওয়ার আলমের প্রত্যাহার ঘিরে সিলেটে বিক্ষোভ অব্যাহত, সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে নাগরিকদের অবস্থান

ডিসি সারওয়ার আলমের প্রত্যাহার ঘিরে সিলেটে বিক্ষোভ অব্যাহত, সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে নাগরিকদের অবস্থান

সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জেলায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, দায়িত্ব পালনের সময় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে সারওয়ার আলমকে সিলেটে বহাল রাখার দাবি জানান।

সোমবার (২২ জুন) সকাল থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘সিলেটের সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। পাশাপাশি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্টসহ বিভিন্ন এলাকায় পৃথক ব্যানারে প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ‘সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ’, ‘সিলেটের যুব সমাজ’ এবং ‘সিলেটের সচেতন তরুণ’সহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ নাগরিকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কয়েকটি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা ‘ডিসি সারওয়ারের প্রত্যাহার মানি না’, ‘সিলেটবাসীর প্রয়োজন ডিসি সারওয়ার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, সারওয়ার আলম দায়িত্ব গ্রহণের পর সিলেটে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে অবৈধ দখল, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তার পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। তাদের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী মহল ও দুর্নীতিবাজ চক্র তার কঠোর অবস্থানের কারণে ক্ষুব্ধ ছিল এবং তারাই পরোক্ষভাবে তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করেছে।

উল্লেখ্য, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাসে আলোচিত সাদা পাথর লুটের ঘটনার পর প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব নিয়ে তিনি সিলেটে যোগদান করেন। প্রায় ১০ মাস দায়িত্ব পালনের পর তার এই বদলির সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ ভিন্ন বিশ্লেষণও তুলে ধরছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের কিছু উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি করে। গত ১২ জুন দুই মাজার পরিদর্শনের সময় সারওয়ার আলম মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এর ধারাবাহিকতায় মাজারে থাকা পুরোনো দানবাক্স পরিবর্তন করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয়।

এই পদক্ষেপের পর বিষয়টি নিয়ে সিলেটে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার দাবিতে ৬৭ বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তারা প্রশাসনের উদ্যোগকে মাজারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ মাজার সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ বেদানন্দ ভট্টাচার্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউদ্দিন আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত এআইজি সৈয়দ বজলুল করিম এবং প্রবীণ আইনজীবী তবারক হোসেনসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন। তারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

এদিকে সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারকে ঘিরে সিলেটে যে জনমত তৈরি হয়েছে, তা স্থানীয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তার সমর্থকরা তাকে সৎ ও কর্মঠ প্রশাসক হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে সমালোচকরা সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে তার বদলির প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

সিলেটবাসীর একাংশের দাবি, সরকারের উচিত জনমতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে ডিসি সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে সিলেটে চলমান আলোচনা ও প্রতিবাদের গতি আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

**ট্যাগ:**
সিলেট, ডিসি সারওয়ার আলম, জেলা প্রশাসক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, সিলেট বিক্ষোভ, মানববন্ধন, নাগরিক সমাজ, সিলেট প্রশাসন, শাহজালাল মাজার, শাহপরান মাজার, দানবাক্স বিতর্ক, সিলেটের রাজনীতি, প্রশাসনিক বদলি, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, সিলেট সংবাদ