চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংসের জন্য নারায়ণগঞ্জে নেওয়ার পথে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। গাড়িতে থাকা রাসায়নিক বা এসিডে আগুন ছড়িয়ে পড়েনি এবং এ ঘটনায় কেউ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
কোথায় ও কীভাবে আগুন লাগল
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মালিবাগ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকা অভিমুখী লেনে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাত পৌনে ৯টার দিকে প্রাণ-আরএফএল বেস্ট ডিপোর সামনে রাসায়নিকবাহী কাভার্ড ভ্যানটির ইঞ্জিনে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার কারণেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
আগুন লাগার খবর পেয়ে সোনারগাঁ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় ১০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কাভার্ড ভ্যানটি হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। গাড়ির চালক ও সহকারী নিরাপদে রয়েছেন।
রাসায়নিক অক্ষত
সোনারগাঁ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহেদ চৌধুরী জানান, কাভার্ড ভ্যানটির ইঞ্জিনে আগুন লাগলেও ভেতরে থাকা কেমিক্যাল বা এসিডে আগুন লাগেনি। দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। ফলে রাসায়নিক পদার্থে আগুন ছড়িয়ে পড়ার মতো বড় ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে কাঁচপুর হাইওয়ে থানার কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, গাড়িতে থাকা রাসায়নিকের ড্রামগুলোতে আগুন ছড়ায়নি। অগ্নিকাণ্ডের পর গাড়িটি পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং ঘটনার পরিস্থিতি মূল্যায়নের প্রক্রিয়া চলছে।
দুই দশক ধরে বন্দরে পড়ে ছিল রাসায়নিক
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক সরিয়ে ধ্বংস করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, এসব রাসায়নিকের কিছু ২০০৩ সাল থেকে বন্দরে পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী এসব পদার্থ পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে চট্টগ্রাম বন্দরের ৮ নম্বর ‘বি’ ইয়ার্ড থেকে নয়টি কনটেইনার বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পাঠানো হয়। এসব রাসায়নিক ধ্বংস করার দায়িত্ব পেয়েছে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া এলাকার ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেড।
কী ধরনের রাসায়নিক রয়েছে
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে সরিয়ে নেওয়া নয়টি কনটেইনারে মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন বিপজ্জনক রাসায়নিক রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।
এসব রাসায়নিক দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকায় বন্দরের নিরাপত্তা ও জায়গা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তাই বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে কনটেইনারগুলো সরিয়ে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিবহন
রাসায়নিকগুলো পরিবহনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কাস্টমসের ধ্বংস কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে পুলিশ প্রহরায় রাসায়নিকবাহী যানবাহনগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেয়। এই কার্যক্রমে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা সহযোগিতা করছে।
তবে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছানোর আগেই বহনকারী একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন লাগার ঘটনায় বিপজ্জনক রাসায়নিক পরিবহনের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে। যদিও আগুন রাসায়নিকের সংরক্ষণস্থলে পৌঁছায়নি এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্টরা
অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটির একটি দল ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রাসায়নিক ধ্বংসের তদারকিতে গঠিত কমিটির সদস্যসচিব মো. রাসেল আহমেদ জানিয়েছেন, মোট ছয়টি কনটেইনার ও তিনটি কাভার্ড ভ্যানে করে এসব মালামাল চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে নেওয়া হচ্ছিল। আগুন লাগা কাভার্ড ভ্যানে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল এবং আগে এসব ড্রামে রাসায়নিক সংরক্ষণ করা হয়েছিল। নিরাপদভাবে ধ্বংসের জন্য ড্রামগুলোও নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হচ্ছিল।
ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও বিপজ্জনক পদার্থ পরিবহনের সময় যানবাহনের নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি পরীক্ষা ও ঘটনার পরিস্থিতি মূল্যায়নের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।