সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২০ দিনে আমানতকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের আবেদন জমা পড়েছে। ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রয়োজনে মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছেন ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহক এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি একই সময়ে ব্যাংকে নতুন আমানতও এসেছে। ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটিতে নতুন করে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত জমা হয়েছে। একই সময়ে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৪টি। এসব নতুন হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংকটিতে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা আমানত এসেছে।
উত্তোলনের আবেদনের চিত্র
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ দিনের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক তাঁদের আমানতের অর্থের একটি অংশ বা মূল অর্থ উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছেন। তাঁদের আবেদনের মোট পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা।
তবে আবেদন করা অর্থের পুরোটা এখনো উত্তোলন করেননি গ্রাহকেরা। ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীদের মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহক মোট ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের আবেদন এখনো নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছিলেন। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের আবেদন নেওয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদনের সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ আরও বেড়েছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে নতুন ব্যাংক
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে। ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগও ওঠে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ার পর এগুলো একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাংককে বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে মোট ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সুদসহ সেই অর্থের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংক খাতে আস্থা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ধার দিয়েছে।
৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দেয়। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে বলেও তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, ব্যাংক খাতে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই বিশেষ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন অর্থ সরবরাহের ফলে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আমানত ফেরতের নিয়ম
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আমানতের মূল অর্থের ওপর কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ থাকবে না। এরপর ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী আমানতের মূল অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা এবং মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। তবে এই সুবিধার আওতায় আমানতের বিপরীতে অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা উত্তোলন করা যাবে না।
কোনো গ্রাহক মেয়াদি আমানতের মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতের ক্ষেত্রে সেটিকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে, গ্রাহক যদি হিসাব চালু রাখেন, তাহলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে মুনাফা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
মূলধন ও আমানত বীমা
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্কিমও ঘোষণা করেছে।
এই ব্যবস্থার বাইরে ব্যক্তি আমানতকারীদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী আবেদন নিয়ে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট শাখা বা উপশাখায় গিয়ে আবেদন করতে হচ্ছে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী পাওনা অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।
২০ দিনে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন এবং একই সময়ে নতুন করে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত আসার তথ্য সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলমান অর্থ ফেরত ও আমানত সংগ্রহ কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরছে। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমানতকারীদের পাওনা অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।